Health Blog

বিশ্ব কিডনি দিবস ও মেয়েদের স্বাস্থ্য

womenkidneyweb-01

প্রতিবছর মার্চে সারা বিশ্বে কিডনি দিবস পালিত হয়ে থাকে, বিশ্বের বিভিন্ন কিডনি ফাউন্ডেশনের অঙ্গসংগঠন গুলোর মতামতের পরিপ্রেক্ষিতে এ বছর ৮ই মার্চ পালিত হতে যাচ্ছে বিশ্ব কিডনি দিবস। এবারের দিবসের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হল- “কিডনি ও মেয়েদের স্বাস্থ্য- অন্তভুক্তিকরণ , মূল্যদান ও অধিকার প্রদান”।

এবারের দিবসের মূল লক্ষ্য হল মেয়েদের মাঝে কিডনি রোগ সংক্রান্ত সচেতনতা সৃষ্টি ও এর প্রতিরোধ তৈরি করা। সারা বিশ্বে কয়েক মিলিয়ন মানুষ কিডনি রোগে আক্রান্ত। এর একটি বড় অংশ হল ক্রনিক কিডনি সমস্যা। এ সমস্যাটি যে কাউকেই আঘাত হানতে পারে যে কোন বয়সে, লিঙ্গে বা বর্ণে।

 

কিডনি বিষয়ে মেয়েদের স্বাস্থ্য

কিডনি ইনফেকশন বা প্রদাহ ও লুপাস নেফ্রপ্যাথি

কিছু কিডনি বিষয়ক সমস্যা যেমন- কিডনি ইনফেকশন বা প্রদাহ ও লুপাস নেফ্রপ্যাথি সাধারণত মেয়েদের ক্ষেত্রে বেশি দেখা দেয়। লুপাস নেফ্রপ্যাথি ( Lupus Nephropathy) হল একটি অটো ইমুন ( Auto Immune) রোগ যাতে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায় ও শরীরের রোগ প্রতিরোধ প্রদানকারী কোষ গুলো কর্মক্ষমতা হারিয়ে নিজেই রোগ সৃষ্টি করে। বিশেষ করে মূত্রের সংক্রমণ মেয়েদের মাঝে সবচেয়ে বেশি হয়ে থাকে যা দুটো কিডনিতেই আক্রান্ত করতে পারে যা পরে পায়েলোনেফ্রাইটিস ( Pyelonephritis) বা কিডনির মাত্রাতিরিক্ত সংক্রমণ তৈরি করে ও পরবর্তীতে গর্ভাবস্থায় অনেক সমস্যার সৃষ্টি করে। সুতরাং, ভাল ফলাফলের জন্য নিয়মিত কিডনির স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা জরুরী।

 

কিডনি ও গর্ভাবস্থা

ক্রনিক কিডনি সমস্যা গর্ভাবস্থায় খুব বিপজ্জনক, যা গর্ভপাত ছাড়াও বাচ্চা নেয়াকালীন প্রসব সমস্যা ও প্রজনন ক্ষমতাকে কমিয়ে দেয়। কিডনি সমস্যায় আক্রান্ত মায়েদের প্রসব পরবর্তী বাচ্চাদের উপর খারাপ প্রভাব ফেলে। বিশেষত ক্রনিক রোগীদের ক্ষেত্রে গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপ ও প্রি-টার্ম বাচ্চা প্রসব হতে পারে। যদিও ডায়ালাইসিস এর মাধ্যমে ক্রনিক সমস্যায় আক্রান্ত মায়েরা কিছুটা উন্নতি লাভ করেন কিন্ত পরবর্তীতে আনুষঙ্গিক চিকিৎসা না করালে অন্যান্য সমস্যা দেখা দিতে পারে।

অল্প বয়সী মেয়েদের মাঝে একিউট কিডনি রোগে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা বেশি থাকে- বিশেষ করে প্রি- এক্লাম্পশিয়া, অকাল গর্ভপাত, এবং প্রসব পরবর্তী রক্তক্ষরণ। যা পরে ধীরে ধীরে ক্রনিক সমস্যার দিকে নিতে পারে।

 

ক্রনিক বা একিউট কিডনি সমস্যার জন্য মেয়েদের ক্ষেত্রে কিছু রিস্ক ফ্যাক্টর কাজ করে যা পুরুষের ক্ষেত্রে থাকেনা। বিশ্ব কিডনি দিবসের  উদ্দেশ্য হল কিভাবে মেয়েদের ক্ষেত্রে এগুলো কমাতে সচেতনতা সৃষ্টি করা যায় ও রোগ প্রতিরোধ করা যায়।

কিডনি রোগ সারা বিশ্বে একটি জটিল সমস্যা। জীবনধারা, খাদ্যাভ্যাস, কর্মপ্রক্রিয়া ইত্যাদি কিছু বিষয় সঠিক ভাবে মেনে চললে এ সমস্যা থেকে অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভম।

 

কিডনির স্বাস্থ্য পরীক্ষা

  • নিয়মিত কিডনির স্বাস্থ্য পরীক্ষা করুন, বিশেষত পরিবারে কারও যদি এ রোগের ইতিহাস থাকে তবে এ রোগে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা থাকে; তাই পরিবারের ইতিহাস জেনে এ বিষয়ে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করুন ও সচেতন হোন।

 

  • ডায়াবেটিস রোগীদের কিডনিতে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে। তাই ডায়াবেটিস রোগীদের এ বিষয়ে আরো সচেতন হতে হবে তাহলে ডায়াবেটিস এর কারণে সৃষ্ট বিভিন্ন কিডনি বিষয়ক জটিলতা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।

 

  • অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ কিডনির স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিস্বরূপ, এটি কিডনিকে অকেজো করার পাশাপাশি শরীরের অন্যান্য সমস্যা যেমন- হার্ট ফেইলিউর, স্ট্রোক ইত্যাদি করে থাকে। তাই নিয়মিত ও নিয়ম মাফিক রক্তচাপ পরীক্ষা জরুরী।

 

  • ব্যায়াম না করা, উচ্চ ক্যালরি যুক্ত খাবার গ্রহণ, অস্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ ইত্যাদি উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের জন্য ঝুঁকি হিসেবে কাজ করে যা কিডনি রোগের জন্য মারাত্মক আকার হিসেবে দেখা দেয়।

 

  • ধূমপান ফুসফুসের জন্য ক্ষতিকারক। এটি বিভিন্ন কিডনি রোগের ঝুঁকিও বাড়িয়ে দেয়।

 

  • অপর্যাপ্ত পানি পান কিডনির উপর চাপ ফেলে। নিয়মিত পর্যাপ্ত পানি পানে কিডনি থাকে সুস্থ ও সবল।

 

লক্ষণসমূহ

কিডনি রোগ, সেটি হোক দীর্ঘমেয়াদি বা স্বল্প মেয়াদি তা সঠিক সময়ে শনাক্ত করা জরুরী, কিন্তু অনেকেই বুঝে উঠতে পারেননা কখন কোন সময়ে তা পরীক্ষা করতে হবে। এ জন্য বেশ কিছু লক্ষণের মাধ্যমে কিডনি রোগ এ কেউ ভুগছেন কিনা তা নির্ণয় করা সম্ভব। কিডনি সমস্যার কিছু লক্ষণ আছে যা আপাত নিরীহ মনে হতে পারে কিন্তু শনাক্ত করতে পারলে তাহলে বড় কোন সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। এর মাঝে কিছু হল-

 

  • ত্বকে ফুসকুড়ি, চুলকনি বা র‍্যাশ
  • বমি বমি ভাব
  • মুখে ধাতব বা মেটালিক স্বাদ
  • অযথা বা ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ
  • প্রস্রাবের রাস্তায় জ্বালাপোড়া
  • মূত্রের অস্বাভাবিকতা
  • মূত্রের বর্ণের পরিবর্তন
  • মূত্রের সাথে রক্ত, পুঁজ, বুদবুদ বা বাতাস ইত্যাদি যাওয়া
  • হাত, পা বা কোমড়ের পিছন অংশ ফুলে যাওয়া
  • অযথা ক্লান্তি বোধ
  • কোমড়ের পিছন থেকে তলপেটে ব্যাথা ইত্যাদি।

উপরের কোন একটি বা একাধিক লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ জরুরী।

 

কিডনি বান্ধব খাবার

আমাদের দৈনন্দিন জীবনে আমরা কত খাবারই খেয়ে থাকি , কিন্ত কখনো কি চিন্তা করে দেখেছি- কি খাচ্ছি আমরা, খাবার ঠিক মত ধুয়ে খাচ্ছি কিনা, ক্যামিক্যাল মুক্ত খাবার খাচ্ছি কিনা?

কিডনি বান্ধব খাবার গুলো আমাদের চারপাশেই ছড়িয়ে আছে যেমন-

  • বিভিন্ন শাকসবজি- লাল শাক, পালং শাক, বাঁধাকপি, ফুল কপি, মুলা
  • বিভিন্ন বেরি জাতীয় ফল- স্ট্রবেরি, রাস্পবেরি, ক্রেনবেরি, ব্লু বেরি ইত্যাদি
  • পিয়াজ ও রসুন
  • অলভ অয়েল ও পিনাট তেল
  • লাল আঙ্গুর
  • ডিমের সাদা অংশ
  • দেশি মুরগি, ছোট মাছ ইত্যাদি।

 

আমাদের দেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা হল খাবারের মাঝে রাসায়নিকের উপস্থিতি। বাজার থেকে কেনা বিভিন্ন শাক সবজি ও ফল মূল এ মেশানো থাকতে পারে বিভিন্ন ক্ষতিকারক উপাদান। এগুলো সরাসরি কিডনির কার্যক্ষমতা কমিয়ে দেয়, পাশাপাশি যকৃত, চোখ, হৃৎপিণ্ড ইত্যাদির উপর বিরূপ প্রভাব ফেলে।তাই বাজারের কেনা শাক সবজি ও ফলাদি কেনার পর ভাল করে ধুয়ে রান্না করা উচিত।

মেয়েদের ও গর্ভবতী মায়েদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা ছাড়াও পরিবারের সকল সদস্যদের ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা চিন্তা করে বুঝে শুনে ও দেখে খাদ্যাভ্যাস ও নিমকানুন মেনে চলা এখন সময়ের চাহিদা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

ডাঃ মির্জা আসিফ আদনান

মেডিকেল অফিসার

সিমেড হেলথ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *