Health Blog

বিশ্ব ডাউন সিন্ড্রোম দিবস

wds.2-01

মানব কোষের অসঙ্গতিপূর্ণ ক্রোমসোমের কারনে ডাউন সিন্ড্রোম হয়ে থাকে। আমাদের সমাজে প্রায়ই ডাউন সিন্ড্রোম বৈশিষ্ট্যপূর্ণ বাচ্চা বা পূর্ণ বয়স্ক মানুষ দেখা যায়।সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল এটি কোন রোগ নয়, বরং জন্মগত একটি বা একাধিক বৈশিষ্ট্যের সমন্বয়।

ডিসেম্বর ২০১১ সালে, জাতিসঙ্ঘের সাধারণ সমাবেশে প্রতিবছর মার্চের ২১ তারিখ বিশ্ব ডাউন সিন্ড্রোম দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়, বাংলাদেশ সহ সারা বিশ্বে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে মার্চের ২১ তারিখ এ দিবসটি পালন করে আসছে। এ বছর দিবসটির ১৩তম বার্ষিকী পালিত হতে যাচ্ছে।

ডাউন সিন্ড্রোম এর বৈশিষ্ট্যধারি ব্যক্তি বা বাচ্চাদের জন্য এ বছরের প্রতিপাদ্য বিষয় – “সমাজের জন্য আমি কি করতে পারি-কি ভাবে ডাউন সিন্ড্রোম এর বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ব্যক্তি/বাচ্চা হিসেবে স্কুল, কর্মক্ষেত্র, সমাজ, জনগণ ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে, সংস্কৃতিতে, অবসরে, মিডিয়াতে বা খেলাধুলায় অর্থপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারি।”

 

ধারনা ও বৈশিষ্ট্যঃ

প্রতিটি বাচ্চা জন্মকালীন বাবা ও মা থেকে ২৩ জোড়া করে মোট ৪৬ টি ক্রোমসোম পেয়ে থাকে। এগুলো জোড়ায় জোড়ায় কোষের মাঝে সুবিন্যাস্ত থাকে। ক্রোমসোম এ থাকে জিন, যা জন্মগত বৈশিষ্ট্যমূলক ধারক ও বাহক হিসেবে কাজ করে। ডাউন সিন্ড্রোম বৈশিষ্ট্যধারি বাচ্চার ২১ নম্বর ক্রোমসোমটি জোড়ায় না থেকে এটির আরেকটি কপি বা ছাপ বা আরেকটি ক্রোমসোম থাকে। অর্থাৎ দুটির বদলে তিনটি থাকে। যেহেতু ২১ নং ক্রোমসোম এ এই ধরনের বাড়তি একটি ক্রোমসোম থাকে তাই বলা হয়ে থাকে ট্রাইসমি-২১। বাড়তি ক্রোমসোমটির কারনে বাচ্চার মস্তিষ্কে প্রভাব ফেলে যার কারনে শারীরিক ও মানসিক কিছু বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। যেমন-

  • সমতল মুখের অবয়ব ও চাপা নাকের আকৃতি
  • ছোট মাথার আকৃতি
  • খাটো আকৃতির ঘাড়
  • জিহবা ফোলা বা খাটো
  • উপরে হেলানো চোখের পাতা
  • ছোট ও অস্বাভাবিক আকৃতির কান
  • দুর্বল হাত ও পা

ডাউন সিন্ড্রোম এর বৈশিষ্ট্যপূর্ণ বাচ্চারা জন্মের সময় অন্যান্য সাধারণ বাচ্চাদের মতই ওজনের হয়ে থাকে, কিন্তু স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত থাকে। বাচ্চাদের মানসিক বিকাশে বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিতে পারে, যেমন-

  • আবেগপ্রবণ বা অসঙ্গতি পূর্ণ আচরণ
  • কোন বিষয়ে ধীর সিদ্ধান্ত গ্রহণ
  • কোন বিষয়ে কম মনোযোগ
  • কোন বিষয়ে ধীরে শিক্ষাগ্রহণ

অন্যান্য কিছু স্বাস্থ্যগত সমস্যা এর পাশাপাশি থাকতে পারে- যেমন,

  • জন্মগত হৃদরোগ
  • বধিরতা
  • ক্ষীণ দৃষ্টি
  • অনিদ্রা
  • চোখে ছানি
  • সহজে ভুলে যাওয়া
  • স্থুলতা
  • হরমোন জনিত সমস্যা
  • আলঝেইমার রোগ (বয়স্কদের হাত বা পা কাঁপা) ইত্যাদি।

ডাউন সিন্ড্রোম এর বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ব্যক্তি/ বাচ্চাদের উপরোক্ত বৈশিষ্ট্য, শারীরিক বা মানসিক বিকাশ একেক জনের ক্ষেত্রে একেক রকম হয়ে থাকে।

 

গর্ভাবস্থায় ও ডাউন সিন্ড্রোম-

যদি মা এর বয়স ৩৫ ও বাবার বয়স ৪০ এর সমান বা উপরে হয়ে থাকে তবে এ ব্যাপারে প্রসব পূর্ববর্তী মায়েদের কিছু পরীক্ষা করা হয়ে থাকে। প্রথম তিন মাসে স্ক্যান ও রক্ত পরীক্ষা করা হয়ে থাকে, যদিও রক্ত পরীক্ষা তে হয়ত ভুল আসতে পারে, সেক্ষেত্রে ১৫ সপ্তাহ পরে এম্নিওসেন্টেসিস বা জরায়ুর পানির পরীক্ষা করা যেতে পারে। দ্বিতীয় ত্রৈমাসিক বা ১৫-২০ সপ্তাহের মাথায় স্ক্যান বা জরায়ুর পানি পরীক্ষা করা হয়ে থাকে, গর্ভস্থ বাচ্চার মস্তিষ্ক, মেরুদণ্ড ও স্নায়ুর বিন্যাস ঠিক আছে কিনা তা স্ক্যানে দেখা হয়ে থাকে। এছাড়া ১৮ সপ্তাহের মাথায় বাচ্চার নাড়ির রক্তের কিছু পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যায়। জন্মের পরপর বাচ্চা ডাউন সিন্ড্রোম এর বৈশিষ্ট্যপূর্ণ হতে যাচ্ছে কিনা তা বিভিন্ন সাধারণ স্বাস্থ্যগত পরীক্ষা ছাড়াও, রক্তের ক্যেরিওটাইপ পরীক্ষা করা হয়ে থাকে।

এ সকল পরীক্ষার মাধ্যমে অকাল গর্ভপাত হওয়ার ভয় থাকতে পারে, সেক্ষেত্রে অনেকেই করতে চান না বা ভয় পান। সুতরাং অভিজ্ঞ চিকিৎসকের মাধ্যমে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ বাঞ্ছনীয়।

ডাউন সিন্ড্রোম একটি জিন গত সমস্যা, এটি বংশগত নয়, তবু ধারনা করা হয়ে থাকে এক তৃতীয়াংশ ক্ষেত্রে এটি বংশগত কারনে হয়ে থাকে। সাধারণত, প্রথম বাচ্চা যদি ডাউন সিন্ড্রোম এর বৈশিষ্ট্যপূর্ণ হয়ে থাকে, তাহলে দ্বিতীয় বাচ্চার সময়ে মা থেকে ১০-১৫ শতাংশ ক্ষেত্রে এই জিন আসতে পারে। এ জন্য ডাউন সিন্ড্রোমে বাচ্চা আক্রান্ত কিনা তা গর্ভকালীন ও প্রসব পরবর্তী বাচ্চার পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ।

 

চিকিৎসা ও করনীয়ঃ

সত্যি বলতে ডাউন সিন্ড্রোম এর বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ব্যক্তি/ বাচ্চাদের পুরোপুরি সুস্থতা লাভের কোন উপায় নেই। আশার কথা এই যে, এ ব্যাপারে এখন দেশে ও বিদেশে বিশাল পরিসরে বিভিন্ন সামাজিক, স্কুল ভিত্তিক, শিক্ষামূলক ও সহযোগিতা মূলক, ব্যক্তিগত ও সরকারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে যাদের সাহায্যে তারা তাদের মেধার বিকাশে উপকৃত হয়ে থাকে। সাধারণত খুব ছোট থেকেই বিভিন্ন শিক্ষার মাধ্যমে তাদের শিক্ষিত করা হয়। বিভিন্ন সংজ্ঞাবহ শিক্ষা, সামাজিক দীক্ষা, আত্ম শিক্ষা, খেলাধুলা বা কর্ম কান্ড ও ভাষাগত শিক্ষা দিয়ে তাদের প্রতিষ্ঠিত করা হয়ে থাকে। ডাউন সিন্ড্রোম এর বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ব্যক্তি/ বাচ্চারা বয়সভিত্তিক সীমার মাঝে বড় হয়ে থাকে, অর্থাৎ তারা সাধারণ বাচ্চাদের মত নির্দিষ্ট সময়ের মাঝে স্কুল বা কাজে যেতে পারেনা, একটু ধীর গতিতে বড় হওয়া ও বোঝার কারনে ধৈর্যসহ তাদের শিক্ষা দিলে খুব সুন্দরভাবে তারা সমাজে মিশতে ও চলতে পারবে। দেখা গেছে যে কোন নির্দিষ্ট বিষয়ের প্রতি তাদের আগ্রহ থাকলে, অন্যান্য ক্ষেত্রে দক্ষতা লাভের পাশাপাশি ঐ বিষয়ে তারা অনেক ভাল কাজ বা দক্ষতা লাভ করে। সামাজিক ও পারিবারিক সমর্থন এর জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই পরিবার থেকেই এ বিষয়ে প্রাথমিক শিক্ষা ও সমর্থন কাম্য।

আমাদের দেশের প্রেক্ষিতে বেশ কিছু সহকারী প্রতিষ্ঠান এ ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে- যেমন,

  • ইন্সটিউট ফর পেডিয়েট্রিক নিওরোসাইন্স এন্ড অটিজম ( ইপনা)
  • অটিজম বিডি
  • বাংলাদেশ ডাউন সিন্ড্রোম এসোসিয়েশন
  • সূচনা ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ
  • স্কুল ফর গিফটেড চিলড্রেন- তরি ফাউন্ডেশন ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

 

ডাঃ মির্জা আসিফ আদনান

মেডিকেল অফিসার

সিমেড হেলথ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *