Health Blog

অন্ত্রনালী ও পায়ুপথ ক্যান্সার সচেতনতা মাস – মার্চ, ২০১৮

colorectal cancer

অন্ত্রনালী ও পায়ুপথ ক্যান্সার সচেতনতা মাস – মার্চ, ২০১৮

 

আমাদের ডাইজেস্টিভ সিস্টেম বা পরিপাকতন্ত্র বলতে শুধুমাত্র পাকস্থলী ও খাদ্যনালীকে বুঝি, সত্যি বলতে পরিপাকতন্ত্র মানে মুখগহবর থেকে পায়ু পথ পর্যন্ত বোঝায়। অর্থাৎ, এর পুরোটাই ডাইজেস্টিভ সিস্টেম এর অংশ। এই পথটি খাবার গ্রহণ, পরিপাক, হজম ও নিঃশেষণ এর কাজ করে। পরিপাক তন্ত্রের খাবার বিষয়ক পুরো প্রক্রিয়াটিকে খাবার ভেদে সাহায্য করে যকৃত, অগ্ন্যাশয় ইত্যাদি। পরিপাক তন্ত্রের সমস্যার মাঝে অন্ত্রনালী ও পায়ুপথের সমস্যা কিন্তু বিরল নয়।

 

যুক্তরাষ্ট্রে, এক গবেষণায় দেখা যায়, পুরুষদের মাঝে প্রতি ২১ জনে ১ জন ও মহিলাদের মাঝে প্রতি ২৩ জনে ১ জন তাদের সারাজীবনে এ রোগে ভোগেন। পুরুষদের মাঝে দ্বিতীয় ও মহিলাদের তৃতীয় মৃত্যুর কারন হিসেবে অন্ত্রনালির ক্যান্সার দায়ী।

কোলোরেক্টাল ক্যান্সার বা অন্ত্রনালি/ পায়ুপথের ক্যান্সার বিনাইন বা ম্যালিগন্যান্ট হতে পারে। ম্যালিগন্যান্ট জাতের ক্যান্সার সাধারণত অচিকিৎসা বা অযত্নের অভাবে অন্যান্য অঙ্গ- প্রত্যঙ্গে ছড়াতে পারে।

 

পায়ুপথ বা অন্ত্রনালীর ক্যান্সারের লক্ষণ

  • খাদ্যাভাস পরিবর্তন বা অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভাস
  • পাতলা পায়খানা বা কোস্টকাঠিন্য
  • মল ত্যাগের পরে পেট খালি না হওয়া ভাব
  • রক্ত সহ মল বা গাড় লাল বা কালো রঙের মল
  • মলদ্বার দিয়ে রক্ত পরা
  • পেট ফাঁপা বা ব্যাথা
  • কিছু না খাওয়ার পরও পেট ভরা ভরা লাগা
  • দূর্বলতা ও অবসাদগ্রস্থ ভাব
  • হঠাত করে ওজন কমে যাওয়া
  • পেটে বা কোমড়ের পাশে মাংসপিণ্ড আকৃতির অনুভব
  • রক্তশূন্যতা ইত্যাদি।

 

রিস্ক ফ্যাক্টর বা যে সকল বিষয় ঝুঁকি সমূহ

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ফুসফুসের ক্যান্সারের পরে পায়ুপথ বা অন্ত্রনালীর ক্যান্সার সারা বিশ্বে পুরুষ ও মহিলাদের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ স্থানে আছে। এখন পর্যন্ত কোন ভালো তথ্য বা অনুসন্ধান পাওয়া যায়নি পায়ুপথ বা অন্ত্রনালীর ক্যান্সারের কারন হিসেবে। তবে ধারনামতে বেশ কিছু কারন দায়ী হতে পারে, যেমন-

  • বৃদ্ধ বয়স
  • উচ্চ মাত্রার প্রাণীজ প্রোটিন, চর্বি জাতীয় খাবার গ্রহণ
  • অল্প আঁশ যুক্ত খাবার গ্রহণ
  • মদ্যপান
  • পূর্বের স্তন, ডিম্বাশয় বা জরায়ুর ক্যান্সারের ইতিহাস থাকলে
  • বংশগত কারো পায়ুপথ বা অন্ত্রনালীর ক্যান্সারের ইতিহাস থাকলে
  • আলসারেটিভ কোলাইটিস, ক্রন্স ডিজিজ বা আই বি ডি ( অন্ত্রনালীর ঘা জাতীয় সমস্যা)
  • স্থুলতা
  • ধূমপান
  • অকর্মন্য থাকা বা কায়িক পরিশ্রম না করা
  • কারো যদি খাদ্যান্ত্রে পূর্ব থেকে পলিপ বা ছোট মাংসপিণ্ড থেকে থাকে, তা ক্যান্সারে রূপান্তরিত হতে পারে।

 

ক্যান্সার স্টেজ

পায়ুপথ বা অন্ত্রনালীর ক্যান্সারের বিভিন্ন ধাপ আছে, চিকিৎসা বেশিরভাগ নির্ভর করে স্টেজ বা ধাপের উপর-

  • স্টেজ (০)- প্রাথমিক ধাপ, এখানে ক্যান্সার সৃষ্টিকারী কোষ অন্ত্রনালির পথে হালকা করে লেগে থাকে, অর্থাৎ নালির ভেতরের পর্দায় অবস্থান করে।
  • স্টেজ (১)- ক্যান্সারটি আস্তে আস্তে বড় হয়, কিন্তু নালিকে ভেদ করেনা।
  • স্টেজ (২)- ক্যান্সারটি আস্তে আস্তে বড় হয়, নালিকে ভেদ করে, কিন্তু আশে পাশের গ্রন্থিতে ছড়ায় না।
  • স্টেজ (৩)- ক্যান্সারটি আস্তে আস্তে বড় হয়, নালিকে ভেদ করে, আশে পাশের গ্রন্থিতে ছড়ায়, কিন্তু আশে পাশের অঙ্গ- প্রত্যঙ্গে ছড়ায়না।
  • স্টেজ (৪)- ক্যান্সারটি আস্তে আস্তে বড় হয়, নালিকে ভেদ করে, আশে পাশের গ্রন্থিতে ও অঙ্গ- প্রত্যঙ্গে ছড়ায়, যেমন- যকৃত, কিডনি, ফুসফুস বা ডিম্বাশয়।

 

সাধারণত ৪০ শতাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়, রোগীরা ক্যান্সারের শেষের পর্যায়ে আসেন, সেক্ষেত্রে অপারেশন ছাড়াও অন্যান্য থেরাপির প্রয়োজন হতে পারে।

 

ডায়াগনোসিস বা রোগ নির্ণয়

পায়ুপথ বা অন্ত্রনালীর ক্যান্সার প্রতিরোধে সবচেয়ে ভাল উপায় হল- স্ক্রিনিং করা ও এ বিষয়ে সচেতনতা লাভ করা।

স্ক্রিনিং হল, নির্দিষ্ট বয়স বা সময় ভেদে বিভিন্ন পরীক্ষার মাধ্যমে নির্দিষ্ট কোন রোগের ক্ষেত্রে আগে থেকেই ধারনা লাভ করা যাতে পরবর্তীতে এ বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে। পায়ুপথ বা অন্ত্রনালীর ক্যান্সারের ক্ষেত্রে তাই স্ক্রিনিং খুব গুরুত্বপূর্ণ, এর মাধ্যমে ক্যান্সার যদি প্রাথমিক স্টেজে থাকে তাহলে দ্রুত চিকিৎসার মাধ্যমে ও কিছু নিয়ম কানুনের মাধ্যমে আক্রান্ত ব্যক্তি দ্রুত আরোগ্য লাভ করতে পারেন। স্ক্রিনিং পরীক্ষার জন্য সাধারণত- মলের রক্ত পরীক্ষা, মলের ডি এন এ, সিগ্ময়েডস্কপি, বেরিয়াম এনেমা এক্সরে, কোলনস্কোপি, সিটি বা এম আর আই করা হয়ে থাকে।

 

পায়ুপথ বা অন্ত্রনালীর ক্যান্সারের চিকিৎসা ও প্রতিকার

পায়ুপথ বা অন্ত্রনালীর ক্যান্সারের চিকিৎসা সাধারণত নির্ভর করে অনেকগুলো বিষয়ের উপর। এর মাঝে টিউমারের বা আক্রান্ত স্থানের অবস্থান, পরিমাপ ও কোন পর্যায়ে আছে তার উপর। সর্বোপরি আক্রান্ত ব্যক্তির স্বাস্থ্যগত অবস্থা, বয়স ইত্যাদির উপর নির্ভরশীল।

চিকিৎসা হিসেবে সাধারণত কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি, এব্লাশন (অপারেশন বিহীন টিউমার ধ্বংস করা) বা ক্রায়ো সার্জারি বা সার্জারি করা হয়ে থাকে। মূলত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের উপর নির্ভর করে আক্রান্ত ব্যক্তি কোন ধরনের চিকিৎসা পাবেন।

অপারেশন পরবর্তী রোগী পুরো সুস্থ হবে কিনা তা নির্ভর করে অনেক কিছুর উপর, যেমন বয়স, স্বাস্থ্যাবস্থা, টিউমার টি কোন পর্যায়ে আছে, কত বড় আকারের, কত তাড়াতাড়ি চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়েছিলেন, টিউমারটি খাদ্যনালীর কোন অংশ ব্লক করেছে কিনা, কোন স্টেজে ধরা পড়েছে- ইত্যাদি বিষয়ের উপর। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ক্যান্সার পুনরায় দেখা দিতে পারে।

 

প্রতিরোধের জন্য-

  • স্ক্রিনিং- যাদের বয়স ৫০ এর উপরে, যাদের বংশগত পায়ুপথ বা অন্ত্রনালীর ক্যান্সারের ইতিহাস আছে বা যাদের দীর্ঘদিন আন্ত্রের ঘা জাতীয় সমস্যা আছে অথবা আদের উপরোল্লিখিত লক্ষণসমূহ আছে তাদের জন্য স্ক্রিনিং গুরুত্বপূর্ণ।

 

  • আহার ও পুষ্টি- প্রচুর পরিমাণে শাক সব্জি, আশঁযুক্ত খাবার, ফলমূল ও ভাল মানের শর্করা জাতীয় খাবার গ্রহণ। ঘনঘন উচ্চমাত্রার প্রোটিন বা লাল মাংস পরিহার, সম্পৃক্ত চর্বি জাতীয় খাবার পরিহার ও এর বদলে স্বাস্থ্যকর চর্বি যেমন- এভোকেডো, জলপাইয়ের তেল, মাছের তেল বা বাদাম উপকারী। এছাড়া ভিটামিন সি ও প্রত্যহ এক কাপ কফি এই ক্যান্সারের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।

 

  • ব্যায়াম- দেখা গেছে নিয়মিত হাল্কা বা মাঝারি ব্যায়ামের কারনে পায়ুপথ বা অন্ত্রনালীর ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়।

 

  • শরীরের ওজন- শরীরের বাড়তি ওজন বা স্থূলতার কারনে পায়ুপথ বা অন্ত্রনালীর ক্যান্সার সহ অন্যান্য ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়।

 

পায়ুপথ বা অন্ত্রনালীর ক্যান্সার ধীর গতির হয়ে থাকে , অর্থাৎ এটি আস্তে আস্তে বড় হয়। তাই এর লক্ষণ প্রকাশের সাথে সাথে স্ক্রিনিং এর মাধ্যমে শনাক্ত করে ব্যবস্থা নিলে ভাল ফল পাওয়া যায়। বয়স ৫০ এর উপরে হলে নিয়মিত স্ক্রিনিং এর আওতায় রেখে ক্যান্সার কোষধারি পলিপ বা টিউমারের চিকিৎসা করালে খুব ভাল ফল পাওয়া যেতে পারে। ক্যান্সার আক্রান্ত ব্যক্তির সারভাইভাল রেট বা জীবন স্থায়ী নির্ভর করে ক্যান্সারটি কোন স্টেজে আছে তার উপর। দেখা যায় ৩৯ শতাংশ ক্ষেত্রে প্রাথমিক স্টেজে পায়ুপথ বা অন্ত্রনালীর ক্যান্সার ধরা পরে, প্রায় ৯০ শতাংশে প্রাথমিক স্টেজে আক্রান্ত মানুষের প্রায় ৫ বছর পর্যন্ত জীবন স্থায়ী হতে পারে বলে ধারনা করা হয় এবং ৭১ শতাংশ ক্ষেত্রে ৫ বছর ধরা হয় মধ্যম স্টেজের ক্ষেত্রে আবার ১৪ শতাংশের ক্ষেত্রে ৫ বছর, যাদের শেষ স্টেজ বা ধাপে ধরা পরে।

 

বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে, পায়ুপথ বা অন্ত্রনালীর ক্যান্সারে আক্রান্ত ব্যক্তিদের কোন বিশেষ তালিকা নেই। তবে গ্লোবাল ডিজিজ বারডেন এর একটি গবেষণায় দেখা গেছে গত ৯০ এর দশক থেকে ২০১৩ পর্যন্ত প্রতি লাখে শতকরা ৮.২ ভাগ বেড়েছে। এই হার মহিলাদের তুলনায় পুরুষদের বেশি, বিশেষত মধ্যবয়স্ক ও বৃদ্ধদের মাঝে এবং প্রতি বছর এই হার ০.৪ শতাংশ করে বাড়ছে। দেখা গেছে, এর মূল কারন গুলো হল- খাদ্যাভাস, পরিশ্রম না করা, স্থুলতা, ধূমপান, এবং মদ্যপান বা মাদক সেবন।

পায়ুপথ বা অন্ত্রনালীর ক্যান্সারের জন্য আত্ম সচেতনতার পাশাপাশি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ভাবে গণসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে একযোগে কাজ করলে এর ভয়াবহতা হ্রাস পাবে বলে আশা করা যায়।

 

ডাঃ মির্জা আসিফ আদনান

মেডিকেল অফিসার

সিমেড হেলথ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *