Health-Blog

রমজান ও উচ্চ রক্তচাপ

bp day

রমজান ও উচ্চ রক্তচাপ

অনেকের ধারনা উচ্চ রক্তচাপ বিশিষ্ট ব্যক্তিগণ রমজানে রোজা বা সিয়াম সাধন করতে পারেন না। এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারনা। পরিমিত ও সুষম খাবারদাবারের মাধ্যমে সুন্দরভাবে আক্রান্ত ব্যক্তিগণ রোজা রাখতে পারেন। এর পাশাপাশি অত্যাবশ্যকীয় বিষয় হল নিয়মিত ও নিয়মমাফিক ভাবে রক্তচাপ মাপা ও নিয়ন্ত্রণে রাখা। কারন উচ রক্তচাপ যদি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় তাহলে বিভিন্ন মরণ-ঘাতি রোগ হতে পারে, যেমন- স্ট্রোক, কিডনি ফেইলিউর, লিভারের সমস্যা, চোখের সমস্যা ইত্যাদি। সুতরাং, রক্তচাপ নিয়মিত পরিমাপের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে রেখে আক্রান্ত ব্যক্তি সহজেই সিয়াম সাধনা করতে পারেন।

শুধুমাত্র খাবার দাবারই নয়, নিয়মিত হাল্কা ব্যায়াম এর মাধ্যমে উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশনে আক্রান্ত ব্যক্তি রোজা রাখতে পারেন।

উপযোগী খাবার নির্বাচন-

  • টক দই উচ্চ রক্তচাপ আক্রান্তের জন্য উপকারী। লো ফ্যাট দুধ/ স্কিমড মিল্ক কিংবা লো ফ্যাট দই খাওয়া যাবে।
  • রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে পটাশিয়ামের ভূমিকা অনেক। তাই ইফতারে পটাশিয়াম যুক্ত ফল ডাবের পানি, খেজুর, কলা, আম, বেল ইত্যাদি খেতে হবে। তাই সেহরি, ইফতার ও রাতের খাবারে উপরিউক্ত ফল খাওয়া যেতে পারে।
  • সবজি স্যুপ, রান্না সবজি, সবজি নুডলস, সবজি স্যান্ডউইচ থেকেও ভালো মাত্রায় পটাশিয়াম আসে, যা উচ্চ রক্তচাপ প্রতিরোধে সাহায্য করে।
  • তেলে বা ডালডায় ভাজা খাবার রক্তচাপ বাড়াতে পারে । তাই ভাজাপোড়া খাবারের বদলে সেদ্ধ করা খাবার, স্যুপ, ফল ইত্যাদি খাওয়া যেতে পারে। ভাজাপোড়া খাবার খেতে হলে উদ্ভিজ্জ তেলে ভাজা বা অসম্পৃক্ত তেলে ভাজা খাবার গ্রহণ করাই শ্রেয়।
  • রক্তচাপ বাড়ানোর মূল প্রভাবক খনিজ এর মাঝে সোডিয়াম হল প্রধান। অতিরিক্ত লবণ, টেস্টং সল্ট, আজমা আটা কিংবা বিট লবণ-যুক্ত খাবার এড়াতে হবে। সয়া সস, ওয়েস্টার সস, আঁচার ইত্যাদি খাবারে প্রচুর লবণ থাকে। তাই এইধরনের খাবার এড়াতে হবে। চেষ্টা করতে হবে বাইরের খাবার না খেয়ে বাড়িতেই এসব উপাদান ছাড়া ইফতার তৈরি করে খাওয়ার। খাবারকে একটু স্বাদযুক্ত করার জন্য লবণ কম ব্যবহার করে যেকোনো হার্বস, গোলমরিচ, সিরকা ইত্যাদি ব্যবহার করা যেতে পারে।
  • ফাস্টফুড, বিরিয়ানি কিংবা যে কোনো ধরণের ফ্যাটযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলতে হবে। তার বদলে সেদ্ধ, ঝলসানো কিংবা বেক করা খাবার খাওয়ার অভ্যাস করতে হবে। এর পাশাপাশি কোমল পানীয় পরিহার করতে হবে। লেবুর শরবত, কাচা আমের জুস বা ঘরে বানানো হালকা চিনিযুক্ত যেকোন ফলের রস উপকারী।

 

ধূমপান বর্জন-
রমজান মাস ধূমপানের অভ্যাস ছাড়ার জন্য সবচেয়ে উপযোগী সময়। সারাদিন না খেয়ে থাকার পর ইফতার শেষে ধূমপানের অভ্যাস উচ্চ রক্তচাপ রোগীদের জন্য খুবই ক্ষতিকর। ধূমপান, উচ্চ রক্তচাপের জন্য প্রভাবক হিসেবে কাজ করে।

ব্যায়াম-

অনেকেই আছেন যারা নিয়মিত ব্যায়াম করেন। কিন্তু রমজান মাসে দৈনিক রুটিনে কিছুটা ব্যাত্যায় ঘটে, তাই এ সময়ে হাল্কা কোন ব্যায়াম করা যেতে পারে। উচ্চ রক্তচাপ বিশিষ্ট ব্যক্তিগণ রাতে নামাজের পরে বা ইফতারের পরে ব্যায়াম করতে পারেন, সেটি হতে পারে স্ট্রেচিং বা ৩০ মিনিটের মত জোড় কদমে হাঁটা।

 

নিয়মিত ওষুধ সেবন-
বেশিরভাগ উচ্চ রক্তচাপ বিশিষ্ট রোগীরা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে ওষুধ খেয়ে থাকেন। দিনের বেলায় যাদের ওষুধ সেবনের সময় থাকে তারা সেহেরির সময় ও রাতের ক্ষেত্রে ইফতারির সময় খেতে পারেন।  অথবা, চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে ওষুধ খাওয়ার সময় ঠিক করে নেইয়া বাঞ্ছনীয়। সঠিক খাবারের পাশাপাশি রোজার সময় সঠিক সময়ে ওষুধ খাওয়া জরুরি।

চিকিৎসকের পরামর্শ-
উচ্চ রক্তচাপ বিশিষ্ট রোজাদার ব্যক্তির নিয়মিত রক্তচাপ পরিমাপ করা বাঞ্ছনীয়, দেখা যায় যে, সাধারণত সকালের দিকে শরীর ভাল থাকলেও বিকেলের দিকে খাবারের মেটাবোলিজমের কারনে দুর্বলতা বোধ আসে। এ সময় রক্তচাপ একটু কম বা তারতম্য দেখা যায়। অন্যদিকে এখন চলছে জ্যৈষ্ঠ মাস, বাইরের প্রখর রোদে বা চলতি পথে মানসিক চাপ সামাল দেয়ায় অনেকের রক্তচাপ হঠাৎ বেশি হতে পারে।  রোজা রেখে অসুস্থ বোধ করলে তাৎক্ষণিক ভাবে রক্তচাপ মাপতে হবে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। যারা উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ গ্রহণ করেন, তাঁদের রক্তের সোডিয়াম হঠাৎ কমে যেতে পারে । তাই চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে রমজানে কমপক্ষে দুবার রক্তের খনিজের মাত্রা পরীক্ষা করা যেতে পারে। 

পরিমিত ঘুম-
রমজান মাসে যেহেতু সেহরির জন্য শেষ রাতে ঘুম থেকে উঠতে হয়, সেহেতু একটু আগেই ঘুমিয়ে পরার অভ্যাস করা ভাল। তাই, তারাবির নামাজ শেষ করে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়া উচিত। পরিমিত ঘুমের অভাবে রক্তচাপ বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

মানসিক চাপ মুক্ত থাকা-

আমরা প্রতিনিয়তই কর্মক্ষেত্রে বা পরিবারে বিভিন্ন মানসিক চাপের মাঝে থাকি, কারো ক্ষেত্রে কম বা কারো বেশি। শুধু উচ্চ রক্তচাপধারী ব্যক্তি-ই নয় সাধারণ ও সুস্থ যে কারোরই মানসিক চাপ মুক্ত থাকা বাঞ্ছনীয়। স্ট্রেস বা মানসিক চাপ উচ্চ রক্তচাপের জন্য একটি বড় প্রভাবক হিসেবে কাজ করে।

আরো কিছু দরকারি টিপস-

  • অতিরিক্ত রোদ এড়িয়ে চলতে হবে।
  • অতিরিক্ত চা, কফি, কোল্ডড্রিংস এড়িয়ে যেতে হবে।
  • সম্ভব হলে দিনে হালকা বিশ্রাম নিতে হবে।
  • অতিরিক্ত চিন্তা এড়িয়ে চলতে হবে।
  • ইফতার ও সেহেরির সময় বেশি করে পানি পান করতে হবে।
  • সম্ভব হলে সেহেরির সময় খাবার পরে একগ্লাস নন ফ্যাট দুধ খেতে হবে।
  • শুধু মাত্র খারাপ লাগলেই রক্তচাপ মাপা নয়, বরং সপ্তাহে কমপক্ষে দুবার সকালে ও বিকেলে রক্তচাপ মাপা উচিত, এতে নিজ থেকেই রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে তাগিদা দেবে বা আত্ম নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করবে।
  • শুধু নিজের নয়, পরিবারের অন্যান্য সদস্য- বাবা, মা বা অন্যান্য সদস্যদের এ ব্যাপারে উৎসাহ দান করা বাঞ্ছনীয়।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।