Health Blog

গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস | পর্ব-২

Posted
gestational-2

গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস | পর্ব-২

 

এতক্ষন ধরে সালমা ও তার বর হা করে শুনছিলেন ডাঃ শবনমের কথা, কিছুটা ধাতস্ত হলে সালমা শবনম কে জিজ্ঞাসা করলেন ডায়াবেটিস কি, কেন হল, কি হবে এখন, আবারো বাচ্চা নষ্ট হবে কিনা, কি করতে হবে ভবিষ্যতে ইত্যাদি।

ডাঃ শবনম হালকা হাসি দিয়ে বললেন দেখুন মা, ভয়ের খুব বেশি কারন নেই, আপনি আমার নির্দেশনা মত চলুন, দেখবেন সব ঠিকঠাক মত আপনার বাচ্চা প্রসব হবে। কিন্তু তার আগে ডায়াবেটিস নিয়ে আপনার করা প্রশ্ন গুলোর উত্তর জেনে নিন।

ডায়াবেটিস মানে রক্তের শর্করা বা চিনির আধিক্য। ডায়াবেটিসের আরেক নাম বহুমূত্র রোগ। যাদের গর্ভকালীন ডায়াবেটিস হয়, তাদের সন্তানধারণের পুরো সময় অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে। এ ছাড়া যাঁদের আগে থেকেই ডায়াবেটিস রয়েছে, তাদের সন্তান গ্রহণের সময়ও সতর্ক থাকা খুবই জরুরি। যেহেতু আপনি জানেন না আগে থেকেই আপনার ডায়াবেটিস ছিল কিনা, তাই, এখন থেকেই প্রথম থেকে চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে থাকতে হবে এবং প্রসব (ডেলিভারি) অবশ্যই হাসপাতালেই করতে হবে। আর সবচেয়ে জরুরী ভাবে আপনার জীবনযাপনে পরিবর্তন আনতে হবে।

এবার জানি গর্ভাবস্থায় একজন নারী কীভাবে বুঝবেন তিনি ডায়াবেটিস আক্রান্ত? এক্ষেত্রে, সাধারণত গর্ভবতী মায়েদের ক্ষুধা বেড়ে যায়। এসব ক্ষেত্রে চিকিৎসকরা রোগীর ইতিহাস জানেন। এ ছাড়া আগে শিশু জন্মানোর সময় ডায়াবেটিস ছিল কি না সেটি জানা হয়। আগের শিশু চার বা সাড়ে চার কেজির ওপরে ছিল কিনা, আগে যদি মৃত শিশু প্রসব হয়, এসব তথ্য জানা হয়। এসব ক্ষেত্রে কিছু বিশেষ পরীক্ষা ( ওজীটিটি) করানো হয়। শিশু গর্ভে আসার প্রায় ৫ মাসের মধ্যে এটি করানো হয়। আবার অনেক ক্ষেত্রে পুনরায় করা লাগে। ৬ থেকে ৮ মাসের মধ্যে এই পরীক্ষা করা হয়।

এক্ষেত্রে যেটা অবশ্যই করনীয় তা হল, চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করে রক্তে চিনি বা শর্করার পরিমাণ আগে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে এবং পরে গর্ভধারণ করতে হবে। যদি শর্করার পরিমাণ কম থাকে অর্থাৎ, ৬-এর নিচে হয় তবে বাচ্চা গ্রহণ করতে পারবেন। যদি ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে না থাকে তবে শিশু অস্বাভাবিকভাবে জন্ম নেওয়ার আশঙ্কা থাকে। এতে শিশু ও মা উভয়ের ক্ষতি হবে। শিশু স্বাভাবিকের থেকে একটু বড় হয়ে জন্ম নিতে পারে। জন্মের পর শিশুর শরীরে শর্করার পরিমাণ বেশি হতে পারে। তাই এসব সমস্যা রোধে শুরু থেকেই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চলতে হবে।

আসুন দেখি কেন আপনার ডায়াবেটিস হল- আসলে এর অনেক কারন হতে পারে, সঠিক ভাবে বলা সম্ভব নয় ঠিক কি কারনে আপনার এই গর্ভকালীন ডায়াবেটিস হল, তবে বেশ কিছু কারণ হল-

  • ডায়াবেটিসের পারিবারিক ইতিহাস থাকলে অর্থাৎ বংশের অন্য কারো ডায়াবেটিস থাকলে
  • আগে কোনো সন্তান অজানা কোন কারণে মারা গিয়ে থাকলে
  • গর্ভ থলিতে পানির পরিমাণ বেশি হলে
  • বারবার যোনিপথে ছত্রাকের সংক্রমণ হলে
  • স্থূলতা
  • বয়স ত্রিশ বা তার বেশি হলে

দেখুন মা, যেহেতু আপনার ডায়াবেটিস ধরা পড়েছে, তাই বেশ কিছু নিয়মের মাঝে আপনাকে চলতে হবে, ভবিষ্যতে একটি সবল ও সুস্থ বাচ্চা প্রসবের জন্য, যেমন-

সঠিক সময়ে অর্থাৎ গর্ভধারণের প্রথম দিকে রক্তে শর্করা আধিক্য ধরা পরলে নিয়ম মতে খাবার খেতে হবে ও শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে । মনে রাখবেন, খাবার সঠিক তালিকা বা নিয়ম মাফিক খাদ্যাভাস মেনে না চললে আপনার সন্তানের স্বাস্থ্যের উপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়তে পারে । ডায়াবেটিসের শিশুরা অন্য শিশু দের থেকে ওজনে ভারী হয়।যার কারনে আপনার স্ক্যেনে বাচ্চা একটু বড় এসেছে, কারণ মায়ের পেটে বাচ্চা অবিরাম অতিরিক্ত চিনি পেয়ে থাকে। কিন্তু জন্মের পর মা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে দ্রুত ভাবে এই শর্করার মাত্রা কমে যায়। হঠাৎ করে এই পরিবর্তনে বাচ্চার রক্তে চিনির মাত্রা কমে যায়, তাই এটি এড়াতে জন্মের পর পর-ই বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়াতে হবে। খাদ্য তালিকায় শর্করা জাতীয় খাবার কম ও শাকসবজি বেশি থাকতে হবে। পানি খাবেন পরিমাণ মত। ডায়াবেটিস আক্রান্ত মায়েদের মোটা হয়ে যাওয়া খুবই স্বাভাবিক তাই ভাল করে বিশ্রাম নিবেন কিন্তু হাঁটাহাঁটিও করবেন। ভারী কাজ করবেন না। এমন কি, বাচ্চা প্রসবের পরেও কমপক্ষে তিন মাস এই নিয়ম মেনে চলতে হবে।

আসুন জানি, গর্ভাবস্থায় মা ও সন্তানের কী কী জটিলতা হতে পারে? মায়ের সমস্যা যেমন, গর্ভাবস্থায় – রক্ত চাপ বৃদ্ধি পেতে পারে, গর্ভ থলিতে পানির পরিমাণ বৃদ্ধি পেতে পারে, নির্দিষ্ট সময়ের আগেই প্রসব বেদনা উঠতে পারে, বাচ্চা নষ্ট হতে পারে, প্রস্রাবের রাস্তায় ইনফেকশন হতে পারে ইত্যাদি। এছাড়াও; প্রসবকালীন বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিতে পারে, যেমন –প্রসবে দেরী হতে পারে,প্রসবের সময় বাচ্চার মাথা বের হলেও কাঁধ আটকে যেতে পারে। এছাড়া প্রসব পরবর্তী –রক্তপাত হতে পারে, ইনফেকশন হতে পারে, মায়ের দুধ আসতে দেরী হতে পারে। শুধু মা এর সমস্যা নয় বাচ্চার ক্ষেত্রেও বেশ কিছু সমস্যা হতে পারে, যেমন-বাচ্চার মাথা বড় হতে পারে, বিকলাঙ্গতা সহ বিভিন্ন জন্ম গত ত্রুটি হতে পারে।

এবার তো সমস্যা শুনলেন, এবার আসুন চিকিৎসা নিয়ে বলি, রক্তের শর্করা খাবার দিয়ে কন্ট্রোলে থাকলে ভালো। না থাকলে ডাক্তারের পরামর্শ মত ইনসুলিন দিতে হবে। ডায়াবেটিসের জন্যে মুখে খাওয়ার ওষুধ গুলো গর্ভাবস্থায় সমস্যা করতে পারে। যদি কন্ট্রোলে থাকে তবে মা স্বাভাবিক ভাবে ভাবে প্রসব করতে পারেন। যাদের রক্তে চিনির মাত্রা স্বাভাবিক থাকবেনা তাদের ডাক্তারই সিজার করার জন্যে বলতে পারেন বা রোগীকে নরমাল ডেলিভারির জন্যে লেবারে আনতে ব্যাবস্থা নিতে পারেন। আসলে একেক রোগীর জন্য একেক ব্যবস্থা। চিকিৎসক রোগীর পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যাবস্থা নিবেন।

 

বাচ্চা প্রসব পরবর্তী নিয়মিত স্বাস্থ্য কেন্দ্রে আসতে হবে। মা কে পরিবারের সদস্যদের মানসিক ভাবে সাপোর্ট দিতে হবে। ভবিষ্যতে মায়ের ডায়াবেটিস হয় কিনা খেয়াল রাখতে হবে।

 

এই বলে ডাঃ শবনম থামলেন, সালমা ও তার বর কিছুটা আশ্বস্ত হলে, তারা কথা দিলেন এখন থেকে নিয়ম করে স্বাস্থ্য কেন্দ্রে আসবেন ও ডাঃ শবনমের পরামর্শ অনুযায়ী চলবেন।

 

ডাঃ মির্জা আসিফ আদনান

মেডিকেল অফিসার

সিমেড হেলথ লিঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *