Health-Blog

আসলাম সাহেবের স্থুলতা | পর্ব – ২

over_weight_11-1_v3

আসলাম সাহেবের স্থুলতা

পর্ব- ২

ওজন বেড়ে গেলে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, শ্বাসকষ্ট, ক্যান্সার, গাউট এবং অস্টিও-আর্থারাইটিস হতে পারে। অতিরিক্ত ক্যালোরিযুক্ত খাদ্যগ্রহণ, কায়িক শ্রমের অভাব, বংশগত কারণে কিছু ক্ষেত্রে জিনের চরিত্রের পরিবর্তন, হরমোন গ্রন্থির গণ্ডগোল, ওষুধের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া, মানসিক অসুস্থতা ইত্যাদিকেই স্থুল বা মোটা হয়ে যাওয়ার জন্য দায়ী করা হয়ে থাকে।

অনেক সময় দেখা যায়, অনেকে আছেন খুব কম পরিমাণে খাচ্ছেন অথচ ওজন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর জন্য ধীর বিপাকক্রিয়া বা ধীরে হজম হওয়া একটি কারন হতে পারে। পাতলা ব্যক্তিদের তুলনায় স্থুলকায় ব্যক্তিদের শরীরে বেশি শক্তি জমা থাকায় তারা গড়ে বেশি পরিমাণ কর্মশক্তি ব্যয় করতে পারে। শরীরে স্নায়ু বা চর্বি তুলনামূলক বেশি থাকার কারনে এগুলো শক্তি সরবরাহ করে থাকে।

অনেক ক্ষেত্রেই মোটা হয়ে যাওয়াটা নিজের হাতে থাকে না। এটা হয় জেনেটিক বা বংশগত কারনে। সাধারণত খাবার থেকে প্রাপ্ত বর্ধিত ক্যালরি মোটা হওয়ার মূল কারন।

অতিরিক্ত ক্যালরি  যদি খরচ না হয়, তাহলে সেটাই মেদের আকারে ওজন বাড়ায়। বিভিন্ন পরিসংখ্যানে দেখা যায় যে, প্রতিদিন যদি নির্ধারিত মাত্রার অতিরিক্ত ১০০ ক্যালোরি গ্রহণ করা হয়, তাহলে তা বছর শেষে ৫ কেজি ওজন বাড়িয়ে দেয়।

এছাড়াও অতিরিক্ত তেল-চর্বি ও শর্করা জাতীয় খাবার, ফাস্টফুড, কোল্ড ড্রিঙ্কস বা অ্যালকোহলও ওজন বাড়ায় ভীষণভাবে। তাছাড়া,  কেউ যদি শারিরীক পরিশ্রম না করে বা কম করে তাহলে ওজন যাবে আরো বেড়ে, আর ওজন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে নানা রোগও। তবে বলা যেতে পারে, মুটিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তাদেরই বেশি যাদের বংশগত বা জীনগত কারন আছে, জীবনধারনের অভ্যাসে যারা শারিরীক পরিশ্রম করেন না বা একেবারেই কম করেন, যাদের খাদ্যাভ্যাসে শর্করা-চর্বি জাতীয় খাবার বেশি বা যারা শাক সবজি ও ফলমূল কম খান। তাছাড়া কিছু কিছু অসুখের কারনে বা অবস্থায়ও একজন মুটিয়ে যেতে পারেন, যেমনঃ কুশিং সিন্ড্রোম (কিছু হরমাধিক্য জনিত রোগ) , বুলেমিয়া নার্ভোসা (অতিরিক্ত খাদ্যাভ্যাস জনিত মানসিক রোগ), গর্ভাবস্থায়, অস্বাভাবিক ঘুম ইত্যাদি। এ ছাড়া কিছু কিছু ওষুধ খাওয়ার কারনেও একজন মুটিয়ে যেতে পারেন, যেমনঃ জন্মবিরতিকরণ পিল।

এতক্ষণ হা করে শুনছিলেন আসলাম, শিহাব কে বললেন, আচ্ছা, ওবেসিটির কারনে কি কি ধরনের সমস্যা হতে পারে? শিহাব একটু দম নিয়ে আবার শুরু করলেন- বললেন এই মুটিয়ে যাওয়ার কারনে রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইডের পরিমান বেড়ে যায় এবং লো ডেনসিটি লাইপোপ্রোটিনের ( এল ডি এল বা খারাপ চর্বি) পরিমান বেড়ে যায়, যা হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুকি বাড়ায় এবং টাইপ ২ ডায়াবেটিসের সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়। উচ্চ রক্তচাপ ও হার্টের বিভিন্ন অসুখ হতে পারে এ থেকে। আর সবচে যেটা বেশি খারাপ বিষয় তা হল- এর কারনে, মেয়েদের ইউটেরাইন বা জরায়ুর ক্যান্সার, সার্ভাইকাল ক্যান্সার,  ওভারিয়ান ক্যান্সার, ব্রেস্ট ক্যান্সার, কোলন ক্যান্সার, রেক্টাল (পায়ু পথের) ক্যান্সার, এন্ডোমেট্রিয়াল বা জরায়ুর কুঠরির ক্যান্সার, হতে পারে। তাছাড়া খাদ্যনালী, লিভার, পিত্তথলি, অগ্ন্যাশয়, কিডনি বা প্রোস্টেট ক্যান্সার এর সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়। এর পাশাপাশি  স্লিপ এপনিয়া (অনিদ্রা), পিত্তথলির সমস্যা, অনিয়মিত মাসিক, বন্ধ্যাত্ব ও অস্টিওআর্থ্রাইটিসও ( হাড় ক্ষয় জনিত রোগ) হতে পারে।

শিহাবের কথা শুনে, আসলাম একটু চিন্তায় পড়ে গেলেন, বললেন তাহলে এখন উপায়? হালকা হাসি দিয়ে শিহাব বললেন-

প্রতিদিন যদি বেশ কিছু ভাল অভ্যাস রপ্ত করতে পারা যায় এবং সেই অনুযায়ী চলা যায়, তাহলে ওবেসিটির হাত থেকে রেহাই পাওয়া সম্ভব। নিয়ম করে যোগ অভ্যাস বা মেডিটেশন, ধূমপান বর্জন, সঠিক খাবারদাবার, সময়মত ঘুমানো ইত্যাদি অভ্যাস ওবেসিটির হাত থেকে রক্ষা করতে পারে।  প্রতিদিন আপনাকে স্বাস্থ্যকর খাবার অভ্যাস করতে হবে।  ফল, সবজি, কম ফ্যাটযুক্ত দুধ জাতীয় খাবার, বাদাম এগুলিকে রাখতে হবে খাদ্য তালিকায়। ঘুম থেকে ওঠার পর কখনও সকালের খাবার বাদ দেয়া যাবেনা।  রাতের খাবারের পর প্রায় ১০ ঘণ্টা যদি খালি পেটে থাকা হয় তাহলে ওবেসিটি হানা দিতে পারে।  তাই, সকালের নাস্তা খুব গুরুত্ব পূর্ণ। পাশাপাশি সকালের খাবারে দুধ, মধু, বাদাম এবং দানাশস্য জাতীয় খাবার রাখা বাঞ্ছনীয়। দুপুরের খাবারের থালায় এক টুকরো ফল সব সময় রাখা উচিত।  সেই সঙ্গে সয়া কিংবা ওটমিল জাতীয় খাবার খাওয়া যেতে পারে।যারা, শরীর সুস্থ রাখতে হালকা ব্যায়াম করেন, ওয়ার্কআউটের আগে বাদাম, ডিম এবং ফল খেতে পারেন। ওয়ার্ক আউটের আধ ঘণ্টা পর ফল বা আমিষ জাতীয় খাবার/ দুধ খাওয়া ভাল। অনেকে আছে্ন যার বিভিন্ন কাজের চাপের জন্য দুপুরের খাবার খেতে ভুলে যান, বা সময়মত খান না। ফলে রাতের খাবারে থাকে বিশাল আয়োজন।  আর এতেই শরীরের ক্ষতি হচ্ছে সবচে বেশি।  রাতে সব সময় সুপ, সালাদ, চর্বি হীন মাংস এবং দই-এর মত খাবার খাওয়া ভাল। তাছাড়া, মানসিক দুশ্চিন্তা বা ‘স্ট্রেস’ শরীরের জন্য খুব ক্ষতিকর, তাই স্ট্রেসমুক্ত থাকা উচিত সবসময়।  শরীর সুস্থ রাখতে ঘুম কিন্তু অত্যন্ত জরুরি।  প্রতিদিন যদি প্রয়োজনীয় ঘুম  না হয় তাহলে ওবেসিটির মত সমস্যা ক্রমশ বাড়তে পারে। ধূমপান ও অ্যালকোহলের অভ্যাস থাকলে খুব দ্রুত এগুলো বাদ দেয়া উচিত, কারন এগুলি ওবেসিটির সম্ভাবনাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। আর, তুলনামূলকভাবে যারা বেশি মোটা বা স্থুল, তাদের ক্ষেত্রে শল্য চিকিৎসা বা সার্জারির সাহায্য নেওয়া যেতে পারে বা বিশেষ ব্যবস্থায় পাকস্থলীর আয়তন বা অন্ত্রের আয়তন কমিয়ে আনা যেতে পারে। এটাকে বলে বেরিয়েট্রিক সার্জারি। এর ফলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি স্বল্প খাবারেই তৃপ্ত হতে পারে ও খাদ্য থেকে খাদ্যগুণ গ্রহণের ক্ষমতাও কমে আসে।

 

এবারে শিহাব সাহেব থামলেন, আসলাম কে বললেন- সবই তো বললাম, এবার বাকিটা তোর হাতে, ওজন কমানোর জন্য যা করনীয় তা যদি ঠিক মত মেনে চলা হয় তাহলে ভাল ফল আশা করা যেতে পারে।

আসলাম, শিহাবের চেম্বার থেকে বের হয়ে রাস্তায় আসলেন, কেমন জানি তার পেট ভুর ভুর করতে লাগল, নাহ কিছু একটা খেতে হবে, নতুন একটা রেস্টুরেন্ট কিছুদিন আগে শুরু হয়েছে, এদের বাবুর্চির রান্না নাকি অমৃতের মত। এসব চিন্তা করতে করতে, কোন ফাকে যে সেই রেস্টুরেন্টের সামনে চলে এলেন, বুঝতে পারেন নি। নাহ, ট্রাই করে দেখা যাক!

 

অত্যাধুনিক এক হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারের বেডে শুয়ে আছেন আসলাম সাহেব, বাইরে অপেক্ষারত শুভাকাঙ্ক্ষীরা। একটু পরে তার অপারেশন শুরু হবে, পাকস্থলীর অপারেশন; যা ছোট করা হবে। কোথায় যেন পড়েছিলেন বিশ্ব বিখ্যাত ফুটবলার ম্যারাডোনারও নাকি এই শল্যচিকিৎসা করা হয়েছিল। অবেদনবিদ আস্তে আস্তে হাসিমুখে এগিয়ে এলে কিছুক্ষণ পরে হাতে সুইয়ের কামড় টের পেলেন, আস্তে আস্তে চোখ বন্ধ হয়ে এল আসলাম সাহেবের।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।